আজকের এই প্রতিযোগিতামূলক ডিজিটাল দুনিয়ায় একটা প্রোডাক্ট কেবল ভালো কোয়ালিটির জন্য সফল হয় না। প্রোডাক্টটা ব্যবহার করতে কতটা সহজ, ইউজারদের জন্য কতটা সুবিধাজনক, আর তাদের অভিজ্ঞতা কতটা ভালো সেটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর এই কারণেই User Experience (UX) ডিজাইন এখন প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্টের সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট একটা পার্ট।
আপনার কোনো অ্যাপ, ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো প্রোডাক্ট যদি তৈরি করেন, কিন্তু ইউজারদের জন্য যদি সেটা জটিল বা বিরক্তিকর হয়, তাহলে সেটা সফল হওয়ার চান্স খুবই কম। তাই এই আর্টিকেলে আমরা জানবো, কীভাবে UX ডিজাইন আপনার প্রোডাক্টকে সাফল্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
UX ডিজাইন আসলে কী?
সাধারণভাবে বলতে গেলে, UX ডিজাইন মানে হলো ইউজারদের জন্য একটা প্রোডাক্ট এতটাই স্মুথ এবং ইজি বানানো যেন তারা সেটা কোনো ঝামেলা ছাড়া ব্যবহার করতে পারে। এটা শুধু দেখার জন্য সুন্দর ইন্টারফেস (UI) তৈরি করা না, বরং ইউজাররা যখন প্রোডাক্টটা ব্যবহার করে, তখন তাদের পুরো অভিজ্ঞতা কেমন হবে সেটা ডিজাইন করা।
উদাহরণ হিসেবে ধরুন, আপনি একটা অনলাইন শপিং অ্যাপ বানিয়েছেন। যদি অ্যাপটা ব্যবহার করতে গিয়ে ইউজাররা কনফিউসড ফিল করে, পছন্দের প্রোডাক্ট খুঁজতে বা অর্ডার করতে ঝামেলা হয়, তাহলে তারা খুব সম্ভবত আর সেই অ্যাপটা ব্যবহার করবে না। কিন্তু যদি UX ডিজাইন ভালো হয়, ইউজাররা সহজেই প্রোডাক্ট খুঁজে বের করতে পারে, অর্ডার করতে পারে, তাহলে তারা সেই অ্যাপটা বারবার ব্যবহার করবে।
প্রোডাক্টের সাফল্যের জন্য UX ডিজাইন কেন জরুরি?
১. ইউজারের প্রথম ইমপ্রেশন:
একটা প্রোডাক্ট বা সার্ভিসের প্রতি ইউজারের প্রথম ইমপ্রেশন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমবার ব্যবহার করেই যদি ইউজারদের মনে হয়, “এটা তো বেশ ইজি!” বা “দারুণ একটা এক্সপিরিয়েন্স পেলাম,” তাহলে তারা সেই প্রোডাক্ট ব্যবহার চালিয়ে যাবে। ভালো UX ডিজাইন আপনার প্রোডাক্টের জন্য একটা পজিটিভ ইমপ্রেশন তৈরি করে।

উদাহরণ হিসেবে ধরুন, Facebook বা Instagram। এই প্ল্যাটফর্মগুলো এত জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, এগুলোর ইন্টারফেস সহজ এবং ইউজার-ফ্রেন্ডলি।
২. ইউজারদের রিটেনশন বাড়ানো:
কোনো প্রোডাক্ট শুধু নতুন ইউজার আনলেই হবে না, বরং সেই ইউজারদের ধরে রাখা আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং। যদি আপনার প্রোডাক্টে ইউজাররা সহজে কাজ করতে পারে এবং তাদের প্রয়োজন মিটে যায়, তাহলে তারা বারবার সেটাই ব্যবহার করবে।

ধরুন, আপনি একটা অনলাইন পেমেন্ট অ্যাপ ব্যবহার করেন। যদি অ্যাপটা তাড়াতাড়ি লোড হয়, সহজে পেমেন্ট করা যায়, আর কোনো বাগ না থাকে, তাহলে আপনি সেটা আবারও ব্যবহার করবেন। আর এটাই ভালো UX ডিজাইনের ম্যাজিক।
৩. কমপ্লেইন বা সমস্যার হার কমায়:
যখন UX ডিজাইন ভালো হয়, তখন ইউজারদের কনফিউশন বা কমপ্লেইন করার পরিমাণ কমে যায়। কারণ তাদের কাজ সহজ হয় এবং সবকিছু স্পষ্টভাবে বোঝানো থাকে।

যেমন ধরুন, একটা ওয়েবসাইটে প্রোডাক্ট কেনার জন্য খুব কম ক্লিক করতে হয় এবং অর্ডার প্রসেস সহজ, তাহলে ইউজারদের কমপ্লেইন করার চান্সও অনেক কমে যায়।
৪. ব্র্যান্ডের প্রতি বিশ্বাস তৈরি:
একটা ভালো UX ডিজাইন শুধু ইউজারদের সন্তুষ্ট করে না, বরং আপনার ব্র্যান্ডের প্রতি তাদের বিশ্বাস বাড়ায়। তারা মনে করে, “এই ব্র্যান্ড আমাদের কথা ভাবে।” Apple এই জিনিসটা খুব ভালোভাবে করে। তাদের প্রোডাক্টগুলো ইউজারদের জন্য এত স্মুথ ডিজাইন করা থাকে যে ইউজাররা তাদের ব্র্যান্ডের প্রতি লয়াল হয়ে যায়।

৫. মার্কেট কম্পিটিশনে এগিয়ে থাকা:
আজকাল প্রতিটি সেক্টরে প্রতিযোগিতা খুব বেশি। যদি আপনার প্রোডাক্টের UX ডিজাইন ভালো হয়, তাহলে সেটা আপনার প্রতিযোগীদের থেকে আপনাকে এগিয়ে রাখবে। ধরুন, একই রকম দুইটা অ্যাপ আছে। যেটার UX ডিজাইন ভালো, ইউজাররা সেটাই বেশি ব্যবহার করবে।

ভালো UX ডিজাইনের উপাদানগুলো কী কী?
ভালো UX ডিজাইন তৈরি করতে গেলে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।
১. ইউজার রিসার্চ:
প্রোডাক্ট তৈরি করার আগে ইউজারদের প্রয়োজন, চাহিদা এবং সমস্যা বুঝতে হবে। তারা কী চায় এবং কীভাবে ব্যবহার করে সেটা জানা খুব ইম্পরট্যান্ট।
২. সিমপ্লিসিটি:
জটিল ডিজাইন এড়িয়ে চলতে হবে। প্রোডাক্ট এমনভাবে ডিজাইন করতে হবে যাতে যেকেউ খুব সহজেই সেটা বুঝতে পারে।

৩. ইন্টারেকটিভ এবং অ্যাট্রাকটিভ ডিজাইন:
ভিজ্যুয়াল এলিমেন্ট যেমন রং, ফন্ট, বাটন প্লেসমেন্ট—এসব কিছুর ওপর ইউজারের এক্সপিরিয়েন্স নির্ভর করে।
৪. টেস্টিং:
একবার ডিজাইন তৈরি করেই থেমে গেলে হবে না। সেটার ওপর ইউজারদের ফিডব্যাক নিতে হবে এবং প্রয়োজনে পরিবর্তন করতে হবে।
বাস্তব উদাহরণ: সফল UX ডিজাইনের গল্প
১. Netflix:
Netflix এর ইন্টারফেস এতটাই ইউজার-ফ্রেন্ডলি যে আপনি খুব সহজে আপনার পছন্দের মুভি বা সিরিজ খুঁজে পাবেন। তাদের পছন্দ অনুযায়ী কনটেন্ট সাজেস্ট করার সিস্টেমও চমৎকার।
২. Amazon:
Amazon-এর ওয়েবসাইট এবং অ্যাপ্লিকেশন ডিজাইন করা হয়েছে এমনভাবে যাতে ইউজাররা কম সময়েই তাদের পছন্দের প্রোডাক্ট খুঁজে পায় এবং সহজেই অর্ডার করতে পারে।

৩. Uber:
Uber-এর অ্যাপ ডিজাইন এত সহজ যে যেকেউ কয়েকটা ক্লিকেই রাইড বুক করতে পারে।
UX ডিজাইনের ভুল হলে কী হয়?
খারাপ UX ডিজাইনের কারণে অনেক বড় বড় কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেমন:
- Google Glass: যদিও এটা একটা অ্যামাজিং টেকনোলজি ছিল, কিন্তু ব্যবহারকারীদের জন্য এটা খুবই কমপ্লিকেটেড ছিল।
- Pepsi’s redesign of Tropicana packaging: তারা প্যাকেজিং রিডিজাইন করলেও ইউজারদের জন্য এটা খুবই কনফিউজিং হয়ে যায়, ফলে সেলস অনেক কমে যায়।
উপসংহার
আপনার প্রোডাক্টের সাফল্যের জন্য UX ডিজাইনকে গুরুত্ব না দিয়ে উপায় নেই। এটা শুধু আপনার প্রোডাক্টকে ইউজারদের কাছে ফেভারিট করে তোলে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে আপনার ব্র্যান্ডের প্রতি তাদের লয়ালিটি বাড়ায়।
তাই, আপনি যদি কোনো অ্যাপ, ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল প্রোডাক্ট তৈরি করতে চান, তাহলে প্রথম থেকেই UX ডিজাইনের দিকে ফোকাস দিন। মনে রাখবেন, ইউজারদের অভিজ্ঞতাই আপনার প্রোডাক্টের সফলতার চাবিকাঠি।

