আই-ফার্মার – বাংলাদেশী এগ্রিকালচারাল ফিন্যান্স এবং সাপ্লাই চেইন প্ল্যাটফর্ম

Share This Post

বাংলাদেশ এর বেশিরভাগ প্রান্তিক কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যগুলো বিক্রির জন্যে সবসময় মিডলম্যানদের উপর নির্ভরশীল। উৎপাদনকারী কৃষক এবং একজন ভোক্তা পর্যন্ত পণ্য পৌঁছাতে প্রায় ৫ থেকে ৭ টি লেয়ার থাকার কারণে কৃষকরা খুব কমই ন্যায্য দাম পেয়ে থাকেন, যেখানে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম থাকে অনেক বেশি। এছাড়াও পণ্য উৎপাদনে লোন ব্যবস্থাপনায়ও করতে হয় অনেক বেশি স্ট্রাগল, আবার পণ্য উৎপাদনের পর সেটি যথাযথভাবে বাজারজাত করতে গিয়েও বিপাকে পড়তে হয় উৎপাদনকারী কৃষকদের। এই মিডলম্যান সমস্যাগুলোর জটিলতা সমাধানে প্রায় তিন বছর আগে একটি উদ্ভাবনী মডেল চালু করেছিলেন ঢাকা বেসড এগ্রি টেক স্টার্টআপ “আই-ফার্মার”।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কৃষকরা প্রায় বেশির ভাগ পণ্যের ক্ষেত্রেই খুব কম শতাংশ পেয়ে থাকেন। এই মিডলম্যান সমস্যাগুলোর জটিলতা সমাধানে নিয়ে প্রায় তিন বছর আগে, ঢাকা বেসড এগ্রি টেক স্টার্টআপ আই-ফার্মার একটি উদ্ভাবনী মডেল চালু করেছিলেন যেখানে খুচরা বিনিয়োগকারীদের সাথে কাজ করে সারা বাংলাদেশ জুড়ে কৃষকদের অনেক প্রয়োজনীয় অর্থায়নে সুযোগ করে দিয়েছে। 

সাধারণত আনুষ্ঠানিক চ্যানেলগুলো থেকে কৃষকরা লোন নেয়ার প্রসেসটি একটি কমন স্ট্রাগল এর মধ্যেই পড়ে এবং উচ্চতর সুদের হারের কারণে চ্যানেলগুলো থেকে লোন নেয়াটাও অনেক বেশি ব্যায়বহুল। এই জটিল সমস্যাগুলোর সমাধান নিয়ে ২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করে, বাংলাদেশ ভিত্তিক লার্জেস্ট এগ্রিকালচারাল ফিন্যান্স এবং সাপ্লাই চেইন প্ল্যাটফর্ম আই-ফার্মার।

যারা কৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগে আগ্রহী এমন রিটেইল ইনভেস্টর দের কাছ থেকে বিনিয়োগ সংগ্রহ করে পরবর্তীতে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত রিটার্ন নিশ্চিত করছে আইফর্মার, এই ইনভেস্ট এর বিনিময়ে একটি নির্ধারিত সময়ে কৃষকদের কাছ থেকে প্রফিট শেয়ার পেয়ে থাকে যা রিটেইল ইনভেস্টরদের সাথে শেয়ার করা হয়। একজন কৃষক একটা নির্দিষ্ট মৌসুম শেষে তার টোটাল প্রফিট এর অংশ আইফার্মার এর সাথে শেয়ার করে যার কারণে কৃষকদের পক্ষেও তাদের রিটার্ন শেয়ার করা অনেক বেশি সহজ হয়। আই-ফার্মার এর এই ইন্টারভেশন কৃষকদের আর্থিক এবং সময়মতো প্রোডাক্ট বাজারজাত করা দুটি বিষয়েরই সমাধান করে।

২০২০ সালের জুনে আই-ফার্মার একটি সাপ্লাই চেইনের বিজনেস রান করতে শুরু করে যেখানে সরাসরি এটি বি-টু-বি কাস্টমারদের সাথে গ্রোসারি এবং কৃষিজাত পণ্য সরবরাহের জন্য কাজ শুরু করে। মার্কেট এনাবল করার জন্য বিজনেস এবং কৃষকদের মধ্যে সরাসরি সমন্বয় সাধন করতে শুরু করে। সংস্থাটি সরাসরি কৃষক কমিউনিটি এর কাছ থেকে তাজা পণ্য সংগ্রহের জন্য টেকনোলজি বেসড সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে, কৃষকদের সরাসরি তাদের প্রোডাক্টগুলোতে সর্বাধিক প্রফিট অর্জন, সিম্পল পেমেন্ট এবং লজিস্টিক সহায়তা সম্পন্ন করে সরাসরি মার্কেট অ্যাক্সেসের ক্ষমতা প্রদান করে। এই এগ্রি টেক স্টার্টআপটির কো-ফাউন্ডার এবং সিইও ফাহাদ ইফাজ এবং আরেকজন কো-ফাউন্ডার এবং সিওও হিসেবে দায়িত্ত পালন করছেন জামিল এম আকবর।

আই-ফার্মার এর কো-ফাউন্ডার এবং সিইও ফাহাদ ইফাজ

বর্তমানে আইফার্মার একটি শক্তিশালী বি-টু-বি এগ্রিকালচারাল প্রডিউস সাপ্লাই বিজনেস তৈরি করেছে যেখানে পাইকার, মডার্ন বিজনেস, রিটেইল ব্যবসায়ী, রপতানিকারক এবং প্রসেসরসহ বিবিধ সংখ্যক ব্যবসায়ের সাথে কাজ করে, যাতে তারা বিনা প্রতিযোগিতামূলক দামে ভালো মানের খামার উৎপাদনে অ্যাক্সেস পায় এবং কাধিক মিডলম্যানদের সাথে ডিল করার বিষয়টি সহজ হয়।আইফার্মার এর সিইও ফাহাদ ইফাজ এর মতে এই প্রজেক্টটি শুরু করার অন্যতম একটি কারণ হলো, “কৃষকদের বাজারে অ্যাক্সেস পেতে এবং তাদের প্রোডাক্ট গুলো আরও বেটার রেট এ বিক্রি করতে সহায়তা করা। স্টার্টআপ টির এর কো ফাউন্ডার এর মতে, একজন কৃষক তার পণ্য নরমাল ভাবে বাজারজাত করার চেয়ে আইফার্মার মাধ্যমে ১০-১৭ শতাংশ বেশি দাম পেতে পারেন।

সাপ্লাই চেইন সুবিধা নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে রান করতে তারা “ট্রাক লাগবে” প্ল্যাটফর্মটির সাথে পার্টনারশিপ করে। ২০২০ সালের জুনে প্রোগ্রামটি চালু হওয়ার পর প্রাথমিকভাবে সংস্থাটি ১৫-২০ টন সবজি সরবরাহ করত যা বর্তমানে এখন বিভিন্ন ক্রেতাকে ৪০০-৪৫০ টন পণ্য সরবরাহ করে। সংস্থাটি তার সমস্ত কৃষককে কর্মসূচির আওতায় এনেছে। যে কৃষকরা আইফার্মারের সাথে কাজ করেন না তারাও চাইলে তাদের পণ্য আইফার্মার এর মাধ্যমে বাজারজাত করতে পারেন।

এখন তাদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সেট আপ করছে। সংস্থাটি কৃষকদের কাছ থেকে শাকসবজি সংগ্রহের জন্য একাধিক স্থানে কালেকশন সেন্টার স্থাপন করেছে এবং ২০২১ সালের শেষ নাগাদ তাদের ১০০ টি কালেকশন সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সংস্থাটি কালেকশন সেন্টারগুলোতে পণ্য বাছাই করে এবং পরে সাজানো পণ্যগুলো তাদের কেন্দ্রীয় ওয়্যারহাউস সাভারে প্রেরণ করে। যেখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্লায়েন্টদের কাছে পৌঁছে যায়। আইফার্মার বর্তমানে ঢাকা এবং সিলেটের ক্লায়েন্টদের পণ্য সরবরাহ করে আসছে, এই পুরো প্রসেস স্মুথ রাখতে পণ্য সরবরাহের জন্য আই-ফার্মারের কৃষকদের সাথে তাদের কোনো ফিক্সড এগ্রিমেন্ট নেই এতে করে কৃষকরাও প্রত্যাশিতভাবে কাজ করতে পারেন।

২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আই-ফার্মার এর আওতায় প্রায় ৮০০০ কৃষক রয়েছেন এবং ফার্ম ইনভেস্টমেন্ট ৪.২ মিলিয়ন ডলার যা লোকাল পেমেন্ট এ প্রায় ৩৪-৩৫ কোটি টাকা। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর এ আই-ফার্মার তাদের “সফল” নাম এ একটি প্রজেক্ট চালু করে যেখানে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৮০০০ কৃষক অনবোর্ড হয়েছেন। 

এছাড়া অল্প সুদে সহজে ইনভেস্টমেন্ট পাবার ক্ষেত্রেও সুবিধা ভোগ করে আইফার্মারের মাধ্যমে। আইফার্মার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ব্যবসায় কৃষকদের সহজে প্রাথমিক বিনিয়োগ পেতে সহায়তা করে। এছাড়া কৃষকদের বিমা সুবিধাও নিশ্চিত করে আইফার্মার। বর্তমানে রাজধানীর বনানীতে তাদের অফিস অপারেশন চালিয়ে আসার পাশাপাশি লিংকডইন এ দেয়া তথ্য অনুযায়ী তাদের এম্পলয়ী সাইজ ১১-৫০ জন এবং তাদের ওয়েব এর সূত্র মোতে ৫ জন এডভাইজর রয়েছে তাদের এই সার্ভিস লিস্ট এ। আজ পর্যন্ত আই-ফার্মার ১০০০০ এরও বেশি কৃষকের সাথে সরাসরি কাজ করেছেন এবং প্রায় ৩৮৫ মিলিয়ন টাকা এগ্রিকালচারাল ফিনান্সিংয়ে ইনভেস্টমেন্ট এ সহায়তা করেছেন।

আই-ফার্মারের কৃষক সেলিম মিয়া

এখন পর্যন্ত ৭ লক্ষ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার সীড ফান্ড ইনভেস্টমেন্ট কালেক্ট করেছেন আইফার্মার। সর্বশেষ অক্টোবর ৩০, ২০২০ এ তারা তাদের সীড ফান্ড কালেক্ট করেছে। দুবাই ভিত্তিক বিনিয়োগকারী ফেলকন নেটওয়ার্ক এবং এক্সিলিটারিং এশিয়া থেকে তারা এই ফান্ডটি সংগ্রহ করেছে। এক্সিলেরেটিং এশিয়ার এই গ্রাজুয়েট প্ল্যাটফর্মটি বর্তমানে ইউএনসিডিএফ ফিনটেক ইনোভেশন ফান্ড এবং স্টার্টআপ বাংলাদেশ আইডিইএ প্রজেক্ট দ্বারা সাপোর্টেড।

অক্টোবর ২০১৯ থেকে, আই-ফার্মার কোনও আনফর্চুনেট দুর্ঘটনা কভার করতে এবং স্পনসরের সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য গ্রিন ডেল্টা এর সাথে বীমা পার্টনারশিপ এ কাজ করছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের সুইস দূতাবাসের “Startup with the Most Social Impact” অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে।  এছাড়াও ২০১৯ সালে “UNDP Youth COLab” এর টপ ফাইভ বিজনেস এবং “Echoing Green Social Impact Business” এর ফাইনালিস্ট হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছিল। 

আই-ফার্মারের লক্ষ্য তিন বছরের মধ্যে সাপ্লাইচেইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পঞ্চাশ হাজার কৃষকের সাথে যুক্ত হওয়া। তাদের পণ্য সরাসরি মধ্যম পর্যায়ের শহুরে পাইকারি ক্রেতাদের কাছে যেমন রপ্তানিকারক, অনলাইন কাঁচাবাজার এবং সুপারশপগুলোর কাছে বিক্রয় করা। শক্তিশালী তথ্য সমৃদ্ধ একটি সাপ্লাই চেইন তৈরির মাধ্যমে আইফার্মার এর লক্ষ্যে দেশের সর্ববৃহৎ বি-টু-বি সরবরাহকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে এবং দেশে সতেজ ও গুণগতমান সম্পন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি যা রপ্তানি খাতকে আরও সম্মৃদ্ধ করবে।

Don't wait!
Get the expert business advice You need in 2022

It's all include in our newsletter!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More To Explore
কাস্টমার সার্ভিস স্কিলস ইম্প্রোভ করার ৭টি টিপস
Marketing

কাস্টমার সার্ভিস স্কিলস ইম্প্রোভ করার ৭টি টিপস

কাস্টমার সার্ভিস হল বিজনেস সুদুরপ্রসারি করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্টেপ। কাস্টমারই আপনার বিজনেস এর লক্ষ্য, আপনার প্রোফিট এর উৎস। তাই কাস্টমার সন্তুষ্ট করতে, একটা ওয়েল স্ট্র্যাকচারড

মার্কেটিং এর জন্য টুইটার অ্যালগরিদম কিভাবে ইউজ করবেন
Marketing

মার্কেটিং এর জন্য টুইটার অ্যালগরিদম কিভাবে ইউজ করবেন

আপনি কি টুইটারের মাধ্যমে এনগেজমেন্ট বাড়াতে এবং লিড তৈরি করতে চাইছেন? অথবা সম্ভবত আপনি আপনার ব্র্যান্ড রেপুটেশন বাড়াতে টুইটার অ্যালগরিদম নেভিগেট করাকে বেশ চ্যালেঞ্জিং মনে